নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার

আমার নানুর কাছে উনার এক ভাইয়ের ছেলের গল্প শুনেছিলাম। তাঁর নাম ছিল বাবুল। তিনি নাকি খুবই সাহসী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধে গিয়েছিলেন। নানু এবং আমার আম্মার মুখে উনার যুদ্ধের সময়ের অনেক সাহসী অপারেশনের কথা শুনেছি। সিলেটের কোন এক অঞ্চলে একটি নদীর উপর সেতু ছিল যা অনেকবার চেষ্টা করেও ভাঙা যায়নি। এই সেতুটি ভাঙতে পারলে নাকি বেশ কয়েকটি জায়গায় পাকিস্তানী মিলিটারীদের যাতায়াত বন্ধ করা সম্ভব ছিল। কারণ ঐ সেতু দিয়েই পাকিস্তানী মিলিটারীরা গাড়ী ও ট্যাঙ্ক নিয়ে অনেক জায়গায় যাতায়াত করতো। বাবুল মামাদের দল থেকে অনেকবার অনেকে চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। শেষে তিনি দলনেতাকে বললেন যে আমি নিজে একবার চেষ্টা করতে চাই এবং হয় সেতুটি ভেঙে ফেরত আসবো না হয় মারা যাবো। সবাই মিলে উনাকে বুঝানো হলো যে এতো বড় সেতু একা ভাঙতে যাওয়াটা বিপদ হবে কিন্তু তিনি কারো কথা শুনতে নারাজ, তিনি যাবেনই। শেষমেষ উনাকে অনুমতি দেয়া হলো। সেতু ভাঙার জন্য তিনি একদম ভোর বেলা ফজরের সময় উঠে জেলে সেজে নদীর তীরে যেতেন আর পরিকল্পনা করতেন যে কিভাবে ধরা না পড়ে সহজেই সেতুটি উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু পরিকল্পনার দ্বিতীয় দিন পাকিস্তানী মিলিটারীরা সন্দেহ করে এবং তিনি ওদের হাতে ধরা পড়েন। তারপর কি পরিমাণ অমানুষিক নির্যাতন করেছে তা নানুর বা আম্মার কাছে শুনলেই গা শিউরে উঠে। তারা যে মানুষ না অমানুষ তা তো আমরা সবাই জানি; আর অমানুষরা অমানুষিক নির্যাতন করবে, এটাইতো স্বাভাবিক! সেসময় উনার কথা শুনে ও উনাকে দেখে ঐ জায়গার এক গরীব বৃদ্ধ মহিলার খুবই মায়া হলো। মহিলাটি নিজে গিয়ে পাকিস্তানী মিলিটারীদের কাছে হাতজোড় করে বললেন যে বাবুল মামাই হচ্ছে উনার একমাত্র ছেলে যে মাছ ধরে বিক্রি করে উনাকে খাওয়ায়। শেষে ঐ অমানুষরা কি মনে করে মামাকে ছেড়ে দিলো আর বৃদ্ধ মহিলা মামাকে নিজের ঘরে নিয়ে তাঁর সর্বস্ব দিয়ে সেবা যত্ন করে সুস্থ করে তুললেন। মামা তখনই বুঝলেন যে এই সেতু উনাকে ভাঙতে হবে, যেমন করেই হোক। পরদিন সকাল বেলা মামা ঠিকই সেতুটি উড়িয়ে দিছিলেন এবং অক্ষত অবস্থায় দলের কাছে ফেরত গেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মামা বাড়িতে ফেরত এসে এসব গল্প করতেন কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তার কয়েকদিন পর মামা কেমন জানি পাগলের মতো হয়ে গেলেন। একদিন কোন কিছু না বলে বাড়ি খেকে চলে গেলেন এবং তিনি এখনও নিখোঁজ! ইস, মামা থাকলেতো এখন উনার মুখেই এসব গল্প শুনতে পারতাম।

এসব গল্প অনেকসময় অনেক জায়গায় শুনে অন্যদের কি অনুভূতি হয় জানি না কিন্তু আমার মনে হয়, ইস যদি আমি যুদ্ধে যেতে পারতাম বা যুদ্ধ করতাম। আমাদের দেশের মানুষজন নিজের দেশ স্বাধীন করার জন্য কি অসাধারণ সাহসের কাজ গুলোই না করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষ, আমরা স্বাধীন দেশ পাইছি ঠিকই কিন্তু আমাদের দেশের জন্য এখনও কাজ করার অনেক কিছুই বাকী। আমার কাছে একটি জিনিস খুবই অবাক লাগে যে স্বাধীনতার জন্য আমরা যুদ্ধ করলাম সেই স্বাধীনতারই অনেকে বিরুধীতা করলো, শুধু বিরুধীতা না বরং স্বাধীনতাকামীদের উপর অমানুষিক অত্যাচারও করলো। সেই স্বাধীনতাবিরুধীরাই এখন আমাদের এই স্বাধীন দেশে রাজার মতো ঘুরে বেড়ায়, বড়ই আজব! তাই আসুন, আমরা যারা একাত্তর এর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি তারা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি, স্বাধীনতাবিরুধীদের বিপক্ষে যুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ১৯৭১ সালে যদি সবাই মিলে পুরো একটা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মাত্র নয় মাসে আমাদের দেশ স্বাধীন করতে পারি তাহলে তার চেয়ে দ্বিগুণ মানুষ নিয়ে কেন আমরা আগের চেয়ে কম সময়ে গোটাকয়েক যুদ্ধাপরাধীদের হাত থেকে দেশকে স্বাধীন করতে পারবো না? যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে হবে, করতেই হবে – মহান স্বাধীনতা দিবসে এই হোক আমাদের নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *