আসুন আমরা প্ল্যান করি!

কয়েকদিন আগে গিয়েছিলাম হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কনফারেন্সে গবেষণাপত্র প্রেজেন্ট করতে। যেহেতু শুরুর দিনটি রোববার সকাল ছিল তাই ক্যাম্পাসে মানুষজনের আনাগোনা স্বাভাবিকের চেয়ে কম ছিল বলে মনে হলো।­ আমি সাইন্স বিল্ডিংটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। সে আমাকে কৌতুকের মতো করে বলে এই বন্ধের দিন সাতসকালে তুমি সাইন্স বিল্ডিংয়ে কী করবে? আমি হেসে দিয়ে বললাম একটি কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করতে আসছি। এটা বলার পর আমিও ওকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম যে তুমিও সাতসকালে ক্যাম্পাসে কী করো? তখন সেও হেসে বললো যে সে বারটেন্ডিংয়ের উপর একটি স্পেশাল ক্লাস হবে সেটা করতে যাচ্ছে! এটা শুনেতো আমি হা হয়ে গেলাম। যারা বারটেন্ডিং ব্যাপারটি জানেন না তাদের জন্য বলছি বিদেশে মদের দোকান বা বারের পিছনে দাঁড়িয়ে যারা মদ পরিবেশন করে তাদেরকে বারটেন্ডার বলে। আসলে বারটেন্ডিং জিনিসটি একটু শৈল্পিক ও সাধনার ব্যাপার বলেই ভালো বারটেন্ডারের কদর বেশি হয় যার জন্য সবাই জিনিসটি কষ্ট করে হলেও শিখতে চায়। আর একজন্যই বন্ধের দিন সাতসকালে হার্ভার্ড পড়ুয়া ঐ ছাত্রটি যাচ্ছিল বারটেন্ডিং এর ক্লাস করতে। তারউপর ক্লাসটি নাকি নিবেন অনেক নামকরা একজন প্রফেসর! যাইহোক সবার আবার এটা মনে করার প্রয়োজন নেই যে ছেলেটি হার্ভার্ড থেকে বারটেন্ডিং এর উপর ডিগ্রি নিতে ভর্তি হয়েছে। তার পড়াশোনার বিষয় হলো গভার্ণমেন্ট অর্থাৎ অনেকটা আমাদের পলিটিক্যাল সাইন্সের মতো। তবে এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, সে বারটেন্ডিং শিখবে বলে প্ল্যান করে রেখেছিল বলেই বন্ধের দিনে সাতসকালে নিজের পড়াশোনার বাইরে একটি ক্লাসে যেতে পেরেছিলো। আমার সাইন্স বিল্ডিংয়ের রাস্তা আর ওর যাওয়ার রাস্তা একই হওয়ায় ওর সাথে এতো গল্প হয়ে গেল। আমি গল্পটি বলার উদ্দেশ্য হলো এটা বুঝানো যে এখানে সবাই পড়াশোনার পাশাপাশি আরোও অনেক কিছুর প্ল্যান করে ও অনেক বিষয়ে জানা ও দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করে। আমাদের ক্লাসেরও অনেক প্রফেসরদের দেখেছি যে ক্লাস ও গবেষণার পাশাপাশি তারা চার্চে যেয়ে গান গায়, গিটার বাজায়, আরোও কত কী করে!

আমাদের দেশে এই চর্চাগুলো একেবারে যে নাই তা বলবো না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এখন জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে নিয়মিতভাবেই বিভিন্ন পুরষ্কার পাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় আমাদের মতো একটি নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব অর্জন অবশ্যই গর্বের। কিন্তু তারপরও আমি বলবো আমাদের অন্যান্য গুণাবলীর চর্চা আরো বেশি করে হওয়া উচিত এবং সে অনুযায়ী প্ল্যানও করা উচিত। মানুষের পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যান্য দক্ষতা ও গুণাবলি একজন মানুষকে পরিপূর্ণ করে গড়ে তোলে। অনেক আগে একবার শুনেছিলাম যে কোন একটি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় দুজন প্রার্থীর রেজাল্ট, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা সবই সমানে সমান। যেহেতু পদ একটি তাই চাকরিদাতারা কোনভাবেই একজনকে নিতে বা আরেকজনকে বাদ দিতে পারছিলেন না। অবশেষে দেখা গেল যে একজন প্রার্থী ইংরেজি ও মাতৃভাষা ছাড়া অতিরিক্ত আরেকটি ভাষা জানেন যা আরেকজন জানেন না। আর তাই অতিরিক্ত ভাষাটি জানার কারণেই ঐ ব্যক্তি চাকরি পেয়ে গেলেন। এজন্য আমাদের সবসময় পড়াশোনারা পাশাপাশি অবশ্যই কিছু না কিছু শেখা উচিত যা নিজেদেরকে যেকোন কাজের জন্য আরোও বেশি যোগ্য করে তুলবে। আমেরিকায় এসে আরেকটা মজার জিনিস উপলব্ধি করলাম। যেকোন কিছুতেই সবাই অনেক আগে আগে প্ল্যান করে রাখে। সেটা হোক পড়াশোনা সংক্রান্ত, কিংবা ক্যারিয়ার সংক্রান্ত কিংবা কোথাও বেড়াইতে যাওয়া সংক্রান্ত। আমার মনে হয় এক্ষেত্র্র্রেও আমরা অনেকখানি পিছিয়ে আছি। তাই আমি সবাইকেই বলবো যে নিজেরা যা হতে চাই বা করতে চাই তার জন্য অনেক আগে থেকেই জানাশোনা ও প্ল্যান করা উচিত। হুটহাট কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে সময় নিয়ে প্ল্যান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিলে তা তুলনামূলকভাবে ভালই হয়। এজন্য উদাহরণস্বরূপ উচ্চশিক্ষার বিষয়টি বলা যেতে পারে। যারা একাডেমিক লাইনে থাকতে চান বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চান তারা যদি ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষ করার আগেই প্ল্যান করেন কোন দেশে যাবেন, কিসের উপর উচ্চশিক্ষা নিবেন তাহলে নিজের জন্যই অনেক সুবিধে হয়। তখন সে অনুযায়ী ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ও ল্যাব খুঁজা, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী নিজের কাগজপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোচানোসহ অনেক ধরণের সুবিধা পাওয়া যায়। সঠিকভাবে প্ল্যান না করার ফলে অনেক সময়ই দেখা যায় যে আমাদের চেয়ে কম যোগ্যতা সম্পন্ন একজন আমাদের চেয়ে অনেক ভালো জায়গায় চলে গেছে। তাই আমি বলবো সবারই নিজ নিজ ক্যারিয়ার অনুযায়ী প্ল্যান করা ও সে অনুযায়ী আগানো উচিত। এতে যেমন নিজের অগ্রগতির পরিমাপ নিজেই করা যাবে তেমনি সঠিক বয়সে ক্যারিয়ারের সঠিক জায়গায় পৌছা যাবে।

অবশেষে সাস্ট ক্যারিয়ার ক্লাবের বার্ষিক ম্যাগাজিন স্ফূরণ এর দ্বিতীয় ইস্যুর জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা রইলো। আসুন আমরা সবাই নিজেদের প্ল্যান নিজেরা করি আর ক্যারিয়ারকে বারটেন্ডিংয়ের মতো শৈল্পিক ও সুন্দর করে তুলি!

One thought on “আসুন আমরা প্ল্যান করি!

Comments are closed.